কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারন প্রতিভার নাম। কবিতা, নাটক, উপন্যাস ও সংগীত সহ সাহিত্যের প্রায় সব ক্ষেত্রে ছিল তার অসাধারন প্রতিভার স্বাক্ষর ও অবাধ বিচরন। তিনি নিজে গান লিখতেন এবং সেই গানের সুর নিজেই দিতেন আবার নিজেই গাইতেন সেই গান। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতাও করেছেন, এবং অধিকার আদায়ে নানা আন্দোলন করেছিলেন।
ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে কাজী নজরুল ইসলামের অবস্থান ছিল বলে তাকে “বিদ্রোহী কবি” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।
কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম
কাজী নজরুল ইসলাম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহাকুমার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ সালের ২৪ শে মে (বাংলা১৩০৬ সালের ১১ ই জ্যৈষ্ঠ) জন্মগ্রহণ করেন।
কাজী নজরুল ইসলামের পিতা ও মাতা
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পিতার নাম ছিল কাজী ফকির আহমেদ এবং মাতার নাম ছিল জাহেদা বেগম। কাজী নজরুল ইসলাম এর বড় আর দুই ভাই ছিল, জন্মের কিছুদিন পরই তারা মারা যায়।
কাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও সন্তান
নার্গিস আসার খনমের সাথে কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম বিয়ে হয়। তার প্রথম বউ এর সাথে তিনি ঘরজামাই থাকতে অস্বীকার করেন এবং পরে আসালতা সেনগুপ্ত (প্রমিলা দেবী) কে বিয়ে করেন।
কাজী নজরুল ইসামের চার জন সন্তান ছিল এবং তাদের নাম হল – কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (বুলবুল), কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ।
কাজী নজরুল ইসলামের নাম দুখু মিয়া কেন?
কাজী নজরুলের নাম দুখু মিয়া হওয়ার পিছনে একটা কারণ রয়েছে। কাজী নজরুলের বড় দুই ভাই জন্মের কিছুদিন পর পরই মারা যান।
জন্মের পর -পর তার বড় দুই ভাই মারা যাওয়ায় জন্মের পর তার দাদী তার নাম দুখু মিয়া রাখেন।
তিনি ছোট বেলায় এই নামেই পরিচিত ছিল এবং এটিই তার ডাকনাম। সেই দুখুমিয়াই বর্তমানের আমাদের জানা সেই বিখ্যাত কাজী নজরুল ইসলাম যিনি রবীন্দ্রনাথের পর বঙ্গমহাদেশের সবথেকে বড় কবি।
নজরুলের প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা জীবন
কাজী হচ্ছে কাজী নজরুল ইসলামের বংশের উপাধি। তার বাবা স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মাজারের মতোয়াল্লি ছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম ছোট বেলা থেকেই ইসলামিক চিন্তাধারা নিয়ে বেড়ে ওঠেন।
বাল্যকালে তিনি নিকটস্থ মক্তব থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। তিনি বাংলা ও আরবি ভাষার পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষাকেন্দ্র থেকে ফারসি ভাষাও রপ্ত করা শুরু করেন।
১৯০৮ সালে যখন তার বয়স মাত্র নয় বছর তখন তার বাবা মারা যান। বাবা মারা যাওয়ায় তার পরিবারে অভাব-অনটন ও দুঃখ-দুর্দশা নেমে আসে। এমতাবস্থায় তার পড়ালেখা বন্ধপ্রায় অবস্থা হয় এবং জীবিকার জন্য মাত্র দশ বছর বয়সে কাজে নামতে হয়।
সেই সময় তিনি মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর তিনি লেটোর দলে যোগ দেন, লেটোর দলে বিভিন্ন পালা গান, জারি গান, মুর্শিদ গান পরিবেশন হতো এবং সেখানে নজরুলের অসাধারন প্রতিভার বলে লেটো দলের প্রধান নির্বাচিত হন। লেটো দলে থাকা অবস্থায় তিনি সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যান এবং কয়েকটি কবিতা,ছড়া গান ও পালাগান রচনা করে অসামান্য দক্ষতা ও প্রতিভার প্রমান দেন।
এরপর তিনি শিক্ষালাভের জন্য গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তির সহযোগিতায় রানিগঞ্জ শেয়ারশোল রাজ স্কুলে আবার ভর্তি হন।
শৈশবকাল থেকেই নজরুল একটু চঞ্চল প্রকৃতির হওয়ায় স্কুলের বাধা ধরা নিয়ম কানুন একদমই সহ্য করতে পারতেন না। তাই তিনি হঠাৎ একদিন স্কুল থেকে উধাও হয়ে যান।
কিন্তু কোথায় যাবেন, কি খাবেন, কীভাবে চলবেন ইত্যাদি ভেবে এবং আর্থিক অভাবের কথা চিন্তা করে তিনি আসানসলের একটি রুটির দোকানে মাসিক পাঁচ টাকা বেতনে চাকরি নেন।
রুটি তৈরির ফাঁকে তিনি বিভিন্ন কবিতা, গান, গজল ইত্যাদি রচনা করেন এবং বিভিন্ন বই পত্র পড়ে তাঁর ঞ্জান ভাণ্ডারকে আরো সমৃদ্ধ করতে থাকেন। তার এমন প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে এক পুলিশ ইন্সপেক্টর তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন এবং ময়মনসিংহ জেলার ডালিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি করে দেন। এরপর তিনি পুনরায় রানীগঞ্জের শেয়ারশোল রাজ স্কুলে ভর্তি হন।
নজরুলের সেনাবাহিনীতে যোগদান
১৯১৯ সালের বিশ্ব যুদ্ধের সময় কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ৯ম শ্রেণীর ছাত্র। যুদ্ধের কারনে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার পড়ালেখা আর হয়ে ওঠেনি।
এরপর তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টন রেজিমেন্টের হাবিলদার পদে প্রমোশন লাভ করেন। সৈনিক জীবনে তাকে চলে যেতে হয় পাকিস্তানের করাচিতে।
কিন্তু সেখানে থেকেও তার কবিতা ও সাহিত্যচর্চা থেমে থাকেনি। করাচির সেনানিবাসে একজন মৌলভীর সাথে তার পরিচয় হয়।
এরপর থেকেই তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গজল এবং সাহিত্য ইত্যাদির ব্যাপক রচনার তাগিদ অনুভব করেন।
কাজী নজরুল ইসলাম প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে তেমন পড়ালেখার সুযোগ না পেলেও তিনি তার কাব্য ও সাহিত্য চালিয়ে গেছেন।
কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য চর্চা
১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে যুদ্ধ থেমে গেলে পলটন রেজিমেন্ট ভেঙেযায় এবং নজরুল নিজের মাতৃভূমি চুরুলিয়া গ্রামে ফিরে আসেন।
এরপর তিনি একনিষ্ঠভাবে তার কাব্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। এরপর ধীরে ধীরে দৈনিক বসুমতি, মুসলিম ভারত, মসিক প্রবাসি, বিজলী, ধুমকেতু প্রভৃতি বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে।
কাজী নজরুলের লেখা কবিতা তদানিন্তন রজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। নজরুল ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতান সংগ্রামের নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিতো ও বঞ্চিত মানুষের জাগরণে ছিলের একজন মহান প্রবক্তা।
তিনি মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৯২১ সালে রচনা করেন তার বিখ্যাত অমর কবিতা “বিদ্রোহী” যা তাকে বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে অমর করে রেখেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম অসংখ্য গান, গজল, কবিতা, সাহিত্য ও উপন্যাস রচনা করে গিয়েছেন। তার রচনাবোলির মধে উল্লেখযোগ্য হল – অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, দোলনচাঁপা, চক্রান্ত, প্রলয় শিখা, ভাঙ্গার গান, নতুন চাঁদ, ফনিমনসা, মৃত্যুক্ষুধা, সাম্যবাদী, সর্বহারা, রাজবন্দী, জবানবন্দি প্রভৃতি।
নজরুল ইসলাম ফারসি ভাসার মহাকবি হাফিজের অনেকগুলো কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের অধিকাংশ কবিতা রুশ ভাষাতেও অনুবাদ হয়েছিল। ইংরেজী ভাষাতেও তার অনেক কবিতা অনুবাদ হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।
বাংলাদেশে নজরুল ইনস্টিটিউট নামে একটি প্রতিষ্ঠান তার লেখার উপর গবেষণা চালাচ্ছে।
নজরুল ইসলামের পুরষ্কার ও সম্মাননা
নজরুল ইসলাম ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কবি “জগত্তারিনী” পুরষ্কার পেয়েছেন।
নজরুল ইসলাম ১৯৬০ সালে ভারত সরকার কর্তৃক “পদ্মভূষন” উপাধিতে ভূষিত হন।
১৯৭০ সালে বিশ্বভারতী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে “ডিলিট” উপাধিতে ভূষিত করেন।
নজরুল ইসলাম ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “ডিলিট” উপাধি লাভ করেন।
নজরুল ইসলামকে ১৯৭৫ সালে একুশে পদক প্রদান করা হয়।
সবশেষে ১৯৭৬ সালে কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ সরকার নাগরিকত্ব প্রদান করে এবং বাংলাদশের জাতিয় কবির মর্যাদা দেন।
নজরুল ইসলামের অসুস্থতা, বাংলাদেশে আগমন ও মৃত্যু
১৯৪২ সালে কাজী নজরুল ইসলাম দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চিরদিনের জন্য বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। দেশের সব চিকিৎসা তাকে সুস্থ্য করতে অপারগ হলে সুচিকিৎসার জন্য সরকারি মাধ্যমে লন্ডনে পাঠান হয় ১৯৫৩সালের ১০মে কিন্তু সেখানেও তিনি সুস্থ্য হননি।
এরপর ১৯৭২ সালে তাকে বাংলাদশের রাজধানী ঢাকায় নিয়ে আশা হয় এবং ঢাকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করান হয়।
অনেকদিন অসুস্থ্য থাকার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (বাংলা ১৩৮৩ সালের ১২ই ভাদ্র) বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম পরলোক গমন করেন।
কবির একটি সঙ্গীতে তাকে মসজিদের পাশে কবর দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন যেন তিনি মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পান।
মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই সঙ্গীতটি।
তাই কবির ইচ্ছা অনুযায়ী কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে জাতীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ বা সমাহিত করা হয়।
(আগস্ট ২৯, ১৯৫৮– জুন ২৫, ২০০৯) একজন আমেরিকান সঙ্গীতজ্ঞ, নৃত্যশিল্পী, গীতিকার, অভিনেতা, সমাজকর্মী এবং ব্যবসায়ী।তিনি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সর্বাধিক বিক্রিত সঙ্গীত শিল্পীদের একজন। জ্যাকসন পরিবারের ৮ তম সন্তান মাইকেল, ১৯৬৩ সালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে একজন পেশাদার সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর তিনি জ্যাকসন ফাইভ নামে একটি মিউজিক্যাল গ্রুপের সদস্য হিসেবে গান করেন।১৯৭১ সাল থেকে মাইকেল একক শিল্পী হিসাবে গান গাইতে শুরু করেন। মাইকেলের গাওয়া পাঁচটি মিউজিক অ্যালবাম বিশ্বের সেরা বিক্রির রেকর্ড করেছে, যেমন – অফ দ্য ওয়াল (১৯৭৯), থ্রিলার (১৯৮২), ব্যাড (১৯৮৭), ডেঞ্জারাস (১৯৯১) এবং হিস্টরি (১৯৯৫)। তাকে পপ রাজা (King of Pop) বা সংক্ষেপে এমজে (Mj) বলা হয়।সঙ্গীত, নৃত্য এবং ফ্যাশনের জগত সহ তার ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করে তিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশ্বব্যাপী ব্যক্তিত্ব হয়ে আছেন।
প্রাথমিক তথ্য
জন্ম নাম:মাইকেল জোসেফ জ্যাকসান
জন্ম:২৯ আগস্ট ১৯৫৮ গ্যারে, ইন্ডিয়ানা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
মৃত্যু:২৫ জুন ২০০৯ (বয়স ৫০) লস অ্যাঞ্জেলস, ক্যালিফোর্নিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
গানের ধরন:পপ, রক, নিউ জ্যাক সুয়িং মিউজিক, সউল মিউজিক
পেশা:সঙ্গীত শিল্পী, গীতিকার, সঙ্গীত প্রযোজক, অভিনেতা, মডেল, নৃত্য শিল্পী, ব্যবসায়ী এবং সমাজসেবক।
মাইকেল ১৯৮০ এর দশকে সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। তিনিই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান সঙ্গীতশিল্পী যিনি এমটিভিতে এত জনপ্রিয়। এমটিভিতে তার গাওয়া গানটির ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।গানের তালে মাইকেলের নাচের কৌশলও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মাইকেলের জনপ্রিয় নাচের মধ্যে রয়েছে রোবট এবং মুনওয়াক। মুনওয়াক আসলে পিছনের দিকে হাঁটার ভঙ্গি, যা সামনের দিকে হাঁটার বিভ্রম তৈরি করে। তিনি পপ মিউজিক এবং মিউজিক ভিডিওর ধারণা পরিবর্তন করেছেন এখন সারা বিশ্বের নৃত্যশিল্পীরা প্রায়ই মাইকেল জ্যাকসনকে শ্রদ্ধা জানায়।মাইকেল জ্যাকসন দু’বার রক অ্যান্ড রোল হল অফ ফেইমে নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনিই এই পৃথিবীর একমাত্র ব্যক্তি যিনি গান লেখক,নাচের (সর্বপ্রথম এবং একমাত্র),”আর এন বি” হল অফ ফেইমে যায়গা করে নিয়েছেন। সঙ্গীত জগতের কেউ এত ক্যাটাগরিতে হল অফ ফেইমে নিজেকে নিতে পারেন নি। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস মাইকেল সর্বকালের সবচেয়ে সফল শিল্পী – ১৩টি গ্র্যামি পুরস্কার, ১৩টি ১ একক এবং ৩৫ কোটিরও (৩৫০ মিলিয়ন) বেশি মাইকেলের অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে৷ “থ্রিলার” (১৮৮২) ১১০ মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি করেছে, এটিকে সর্বকালের সেরা বিক্রিত অ্যালবাম বানিয়েছে। “ব্যাড” (১৯৮২), যার ৫টি গান আছে বিলবোর্ড চার্টে নম্বর ১এ, মাইকেল জ্যাকসনের সর্বকালের দ্বিতীয় সেরা বিক্রিত অ্যালবাম এবং ৬৭মিলিয়ন কপি বিক্রি হয় । “ডেঞ্জারাস”(১৯৯১) যার মাধ্যমে মাইকেল “নিউ জ্যাক সুইং” নামে নতুন একটা জেনার কে পপুলার করে,এবং এটি সবচেয়ে বেশি বিক্রিত হওয়া নিউ জ্যাক সুইং এলাবাম, যার পরিমাণ ৩৬ মিলিয়ন কপি।”হিস্টোরি”(১৯৯৫) মাইকেলের নবম স্টুডিও এলবাম এবং এই পর্যন্ত ৩৩ মিলিয়ন(৬৬ মিলিয়ন ইউনিট), যা হচ্ছে এই পর্যন্ত ২ টি ডিস্ক সমন্বিত একটি এলবাম এর সবচেয়ে বেশি বিক্রিত এলবাম। হিস্টোরি একটি বহুল আলোচিত প্রতিবাদি এলবাম। তার ২ বছর পর ১৯৯৭ সালে তিনি রিলিজ করেন তার সর্বপ্রথম রিমিক্স এলবাম “ব্লাড অন দা ডান্স ফ্লোর:হিস্টোরি ইন দা মিক্স” যা এই পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিক্রিত হওয়া রিমিক্স এলবাম(৬ মিলিয়ন কপি)। ২০০১ সালে মাইকেল রিলিজ করে “ইনভিন্সিবল”, তার জিবনের ১০ম ও সর্বশেষ স্টুডিও এলবাম।এটি থ্রিলার এর থেকেও তাড়াতাড়ি বিক্রি হচ্ছিল,কিন্তু “সনি মিউজিক ” এর সাথে সমস্যার কারণে তারা এই এলবামটি প্রোমোট না করে , তার পরেও এটি ১৩ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়। এটি এই পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যায়বহুল এলবাম, এই এলবাম এর শুধুমাত্র রেকর্ডিং এই মাইকেল খরচ করে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের উপর। ২০১০ সালে বিলবোর্ড কর্তৃক একটি পোলে এই এলবামটি ২০০০-২০১০ সালের মধ্যে রিলিজ পাওয়া এলবাম এর সেরা এলবাম নির্বাচিত হয়। জ্যাকসন হচ্ছে এই পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি এওয়ার্ড ও নোমিনেশন পাওয়া তারকা।ব্যক্তিগত জীবনে নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়লেও প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত ছিলেন । তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গায়ক ও নৃত্যশিল্পীর সিংহাসনে বসে আছেন। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আজকের বিশ্বে তার মতো তারকা নেই।
২৫শে জুন ২০০৯ সালে মাইকেল জ্যাকসন মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল।যখন TMZ তার ওয়েবসাইটে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে, তখন তা দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।তার মৃত্যু বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলেছিল।সারা বিশ্বের ভক্ত ও সাধারণ মানুষ তার সম্পর্কে তথ্যের জন্য গুগলে অনুসন্ধান শুরু করে।”Michael Jackson” শব্দটি এত বেশি(মিলিয়ন মিলিয়ন) ইনপুট হবার কারণে তারা ভেবেই বসে DDoS Virus এ তাদের সার্চ ইঞ্জিন আক্রান্ত হয়েছে যার ফলে তারা প্রায় ৩০ মিনিট গুগল বন্ধ রাখে।এক ঘণ্টারও কম সময়ে, ১২ লাখেরও বেশি মানুষ উইকিপিডিয়ায় মাইকেলের জীবনী দেখে আর এই চাপের কারণে উইকিপিডিয়া বিপর্যস্ত হয়েছে (পরে কর্তৃপক্ষ জানায় তাদের ইতিহাসে এরকম ঘটনা এই প্রথম)। এভাবেই টুইটার ক্র্যাশ হয়
দায়িত্বে খামখেয়ালি করার কারণে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী মার্কিন চিকিৎসকডঃ কনরাড মারেকে ৪ বছরের জন্য কারাবাস সাজা দেয়া হয়েছিল।
জীবদ্দশায় ক্যামেরায় তোলা হাসন রাজা একমাত্র এই ছবিটি কলকাতার একটি স্টুডিওতে তোলা হয়।
দেওয়ান অহিদুর রাজাচৌধুরী বা দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী (ছদ্মনাম)প্রকৃত নাম ছিল অহিদুর রাজা সিলেটিরা রাজা শব্দটিকে রেজা বা রজা বলেন বা লিখেন তাই উনাদের নামে রেজা বা রজা লিখা ছিল তবে আসলে শব্দটি রাজা হবে । আসল শব্দ বা নামটি হলো অহিদুর রাজা কিন্তু তিনি হাসন রাজা নামেই সুপরিচিত ছিলেন । মরমী সাধনা বাংলাদেশে দর্শনচেতনার সাথে সঙ্গীতের এক অসামান্য সংযোগ ঘটিয়েছে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে লালন শাহ্ এর প্রধান পথিকৃৎ। এর পাশাপাশি নাম করতে হয় ইবরাহীম তশ্নাদুদ্দু শাহ্, পাঞ্জ শাহ্, পাগলা কানাই, রাধারমণ দত্ত, আরকুম শাহ্, শিতালং শাহ, জালাল খাঁ এবং আরো অনেকে। তবে দর্শনচেতনার নিরিখে লালনের পর যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নামটি আসে, তা হাসন রাজার। দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরীপেশাকবি এবং বাউল শিল্পী
হাছন রাজার জন্ম ১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর (৭ পৌষ ১২৬১) সেকালের সিলেট জেলারসুনামগঞ্জ শহরের নিকটবর্তী সুরমা নদীর তীরে লক্ষণছিরি (লক্ষণশ্রী) পরগণার তেঘরিয়া গ্রামে। হাছন রাজা জমিদার পরিবারের সন্তান। তার পিতা দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী ছিলেন প্রতাপশালী জমিদার। হাসন রাজা তাঁর তৃতীয় পুত্র। আলী রাজা তাঁর মাসতুতো /খালাতো ভাই আমির বখ্শ চৌধুরীর নিঃসন্তান বিধবা হুরমত জাহান বিবিকে পরিণত বয়সে বিয়ে করেন। হুরমত বিবির গর্ভেই হাছন রাজার জন্ম। হাছনের পিতা দেওয়ান আলী রাজা তার অপূর্ব সুন্দর বৈমাত্রেয় ভাই দেওয়ান ওবেদুর রাজার পরামর্শ মত তাঁরই নামের অনুকরণে বা আকারে তাঁর নামকরণ করেন অহিদুর রাজা।
হাছন রাজার পূর্বপুরুষেরা হিন্দু ছিলেন। তাদেরই একজন বীরেন্দ্রচন্দ্র সিংহদেব মতান্তরে বাবু রায় চৌধুরী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।হাছন রাজার পুর্বপুরুষের অধিবাস ছিল অয্যোধ্যায়। সিলেটে আসার আগে তারা দক্ষিণবঙ্গের যশোর জেলার কাগদি নামক গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানার কোণাউরা গ্রামে তার পূর্ব পুরুষ বিজয় সিংহ বসতি শুরু করেন, পরে কোন একসময় বিজয় সিংহ কোণাউরা গ্রাম ত্যাগ করে একই এলাকায় নতুন আরেকটি গ্রামের গোড়াপত্তন করেন এবং তার বংশের আদি পুরুষ রামচন্দ্র সিংহদেবের নামের প্রথমাংশ “রাম” যোগ করে নামকরণ করেন রামপাশা।
সিলেটে তখন আরবী–ফার্সির চর্চা খুব প্রবল ছিল। সিলেটে ডেপুটি কমিশনার অফিসের নাজির আবদুল্লা বলে এক বিখ্যাত ফার্সি ভাষাভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ মতে তার নামকরণ করা হয়- হাসন রাজা। বহু দলিল দস্তাবেজে হাসন রাজা আরবি অক্ষরে নাম দস্তখত করেছেন- হাসান রাজা। হাসন দেখতে সুদর্শন ছিলেন। মাজহারুদ্দীন ভূঁইয়া বলেন, “বহু লোকের মধ্যে চোখে পড়ে তেমনি সৌম্যদর্শন ছিলেন। চারি হাত উঁচু দেহ, দীর্ঘভূজ ধারাল নাসিকা, জ্যোতির্ময় পিঙ্গলা চোখ এবং একমাথা কবিচুল পারসিক সুফীকবিদের একখানা চেহারা চোখের সম্মুখে ভাসতো।”(পৃ. ১৪, ঈদ সংখ্যা ‘হানাফী’, ১৩৪৪)”। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে তিনি কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি। তবে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। তিনি সহজ-সরল সুরে আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় সহস্রাধিক গান রচনা করেন।
উত্তারিধাকার সূত্রে তিনি বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন ভোগবিলাসী এবং শৌখিন। রমণীদের কাছে হাসন রাজা নিজের দেহদানে ছিলেন অক্লান্ত। তার এক গানে নিজেই উল্লেখ করেছেন-“”সর্বলোকে বলে হাসন রাজা লম্পটিয়া””
প্রতিবছর বিশেষ করে বর্ষাকালে নৃত্য-গীতের ব্যবস্থাসহ তিনি নৌকায় চলে যেতেন এবং বেশ কিছুকাল ভোগ-বিলাসের মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করে দিতেন। এর মধ্যেই বিশেষ বিশেষ মুহুর্তে তিনি প্রচুর গান রচনা করেছেন, নৃত্য এবং বাদ্যযন্ত্রসহ এসব গান গাওয়া হত। আশ্চর্যের বিষয় হল, এসব গানে জীবনের অনিত্যতা সম্পর্কে, ভোগ-বিলাসের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
হাছন রাজা পাখি ভালোবাসতেন। ‘কুড়া’ ছিল তার প্রিয় পাখি। তিনি ঘোড়া পুষতেন। তার প্রিয় দুটি ঘোড়ার নাম ছিল জং বাহাদুর এবং চান্দমুশকি।এই ভাবে হাছন রাজার মোট ৭৭টি ঘোড়ার নাম মিলে মোটকথা, শৌখিনতার পিছনেই তার সময় কাটতে লাগলো। আনন্দ বিহারে সময় কাটানোই হয়ে উঠলো তার জীবনের একমাত্র বাসনা। তিনি প্রজাদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগলেন। অত্যাচারী আর নিষ্ঠুর রাজা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে উঠলেন।
হাছন রাজা দাপটের সঙ্গে জমিদারী চালাতে লাগলেন। কিন্তু এক আধ্যাত্নিক স্বপ্ন-দর্শন হাছন রাজার জীবন দর্শন আমূল পরিবর্তন করে দিল। হাছন রাজার মনের দুয়ার খুলে যেতে লাগলো। তার চরিত্রে এলো এক সৌম্যভাব। বিলাস প্রিয় জীবন তিনি ছেড়ে দিলেন। ভুল ত্রুটিগুলো শুধরাতে শুরু করলেন। জমকালো পোশাক পড়া ছেড়ে দিলেন।
অন্য একটি ঘটনার কথা জানা যায়, ১৮৯৭ সালে একটি ৮.২ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। যা গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক নামে পরিচিত। হাছন রাজার একটি পোষা হাতি ছিল যেটি ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট একটি ফাটলে পরে মারা যায়। এঘটনার পর হাছন রাজা মর্মাহত হন এবং তিনি এর পরে মরমী কবি হয়ে উঠেন।
ঘটনা যাই হোক, শুধু বহির্জগত নয়, তার অন্তর্জগতেও এলো বিরাট পরিবর্তন। বিষয়-আশয়ের প্রতি তিনি নিরাসক্ত হয়ে উঠলেন। তার মনের মধ্যে এলো এক ধরনের উদাসীনতা। এক ধরনের বৈরাগ্য। সাধারণ মানুষের খোঁজ-খবর নেয়া হয়ে উঠলো তার প্রতিদিনের কাজ। আর সকল কাজের উপর ছিল গান রচনা। তিনি আল্লাহ্র প্রেমে মগ্ন হলেন। তার সকল ধ্যান ধারণা গান হয়ে প্রকাশ পেতে লাগলো। সেই গানে তিনি সুরারোপ করতেন এ ভাবেঃ“লোকে বলে বলেরে, ঘর বাড়ি ভালা নায় আমার কি ঘর বানাইমু আমি, শূন্যের-ই মাঝার ভালা করি ঘর বানাইয়া, কয় দিন থাকমু আর আয়না দিয়া চাইয়া দেখি, পাকনা চুল আমার।
এভাবে প্রকাশ পেতে লাগলো তার বৈরাগ্যভাব। হাছন রাজা সম্পূর্ণ বদলে গেলেন। জীব-হত্যা ছেড়ে দিলেন। কেবল মানব সেবা নয়, জীব সেবাতেও তিনি নিজেকে নিয়োজিত করলেন। ডাকসাইটে রাজা এককালে ‘চন্ড হাছন’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এবার তিনি হলেন ‘নম্র হাসন’। তার এক গানে আক্ষেপের হাহাকার ধ্বনিত হয়েছেঃ“ও যৌবন ঘুমেরই স্বপন সাধন বিনে নারীর সনে হারাইলাম মূলধন”
পরিণত বয়সে তিনি বিষয় সম্পত্তি বিলিবণ্টন করে দরবেশ-জীবন যাপন করেন। তার উদ্যোগে হাসন এম.ই. হাই স্কুল, অনেক ধর্ম প্রতিষ্ঠান, আখড়া স্থাপিত হয়।
হাছন রাজার চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় তার গানে। তিনি কত গান রচনা করেছেন তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। ‘হাছন উদাস’ গ্রন্থে তার ২০৬ টি গান সংকলিত হয়েছে। এর বাইরে আর কিছু গান ‘হাছন রাজার তিনপুরুষ’ এবং ‘আল ইসলাহ্’ সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। শোনা যায়, হাছন রাজার উত্তরপুরুষের কাছে তার গানের পান্ডুলিপি আছে। অনুমান করা চলে, তার অনেক গান এখনো সিলেট-সুনামগঞ্জের লোকের মুখে মুখে আছে, কালের নিয়মে বেশ কিছু গান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পদ্যছন্দে রচিত হাছনের অপর গ্রন্থ ‘শৌখিন বাহার’-এর আলোচ্য বিষয়-‘স্ত্রীলোক, ঘোড়া ও কুড়া পাখির আকৃতি দেখে প্রকৃতি বিচার(লোকসাহিত্য পত্রিকা, জুলাই-ডিসেম্বর ১৯৭৯। সৈয়দ মুর্তাজা আলী,’মরমী কবি হাসন রাজা’)। ‘হাছন বাহার’ নামে তার আর একটি গ্রন্থ কিছুকাল পূর্বে আবিস্কৃত হয়েছে। হাছন রাজার আর কিছু হিন্দী গানেরও সন্ধান পাওয়া যায়।
মরমী গানের ছক-বাঁধা বিষয় ধারাকে অনুসরণ করেই হাছনের গান রচিত। ঈশ্বানুরক্তি, জগৎ জীবনের অনিত্যতা ও প্রমোদমত্ত মানুষের সাধন-ভজনে অক্ষমতার খেদোক্তিই তার গানে প্রধানত প্রতিফলিত হয়েছে। কোথাও নিজেকে দীনহীন বিবেচনা করেছেন, আবার তিনি যে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রকের হাতে বাঁধা ঘুড়ি সে কথাও ব্যক্ত হয়েছেঃ“গুড্ডি উড়াইল মোরে,মৌলার হাতের ডুরি। হাছন রাজারে যেমনে ফিরায়, তেমনে দিয়া ফিরি।। মৌলার হাতে আছে ডুরি, আমি তাতে বান্ধা।
জযেমনে ফিরায়, তেমনি ফিরি, এমনি ডুরির ফান্ধা।।”
এই যে ‘মৌলা’ তিনিই আবার হাছন রাজার বন্ধু। স্পর্শের অনুভবের যোগ্য কেবল, তার সাক্ষাৎ মেলে শুধুমাত্র তৃতীয় নয়নেঃ“আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে। আরে দিলের চক্ষে চাহিয়া দেখ বন্ধুয়ার স্বরূপ রে।।”
কিন্তু এই বন্ধুর সনে হাসন রাজার প্রেমের আশা বাঁধা পেত স্বজন ও সংসার। হাছনের খেদঃ“স্ত্রী হইল পায়ের বেড়ি পুত্র হইল খিল। কেমনে করিবে হাসন বন্ধের সনে মিল।।”
এদিকে নশ্বর জীবনের সীমাবদ্ব আয়ু শেষ হয়ে আসে- তবু ‘মরণ কথা স্মরণ হইল না, হাছন রাজা তোর’। পার্থিব সম্পদ, আকাঙ্ক্ষা আর সম্ভোগের মোহ হাছন রাজাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আবার নিজেই নিজের ভুল বুঝতে পারেনঃ“যমের দূতে আসিয়া তোমার হাতে দিবে দড়ি। টানিয়া টানিয়া লইয়া যাবে যমেরও পুরিরে।। সে সময় কোথায় রইব (তোমার) সুন্দর সুন্দর স্ত্রী। কোথায় রইব রামপাশা কোথায় লক্ষণছিরি রে।। করবায় নিরে হাছন রাজা রামপাশায় জমিদারী। করবায় নিরে কাপনা নদীর তীরে ঘুরাঘুরি রে।। (আর) যাইবায় নিরে হাছন রাজা রাজাগঞ্জ দিয়া। করবায় নিরে হাছন রাজা দেশে দেশে বিয়া রে।। ছাড় ছাড় হাছন রাজা এ ভবের আশা। প্রাণ বন্ধের চরণ তলে কর গিয়া বাসা রে।।”
এই আত্নবিশ্লষণ ও আত্নোপলব্ধির ভেতর দিয়েই হাছন রাজা মরমী-সাধন-লোকের সন্ধান পেয়েছিলেন।
মরমীসাধনার বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে জাতধর্ম আর ভেদবুদ্ধির উপরে উঠা। সকল ধর্মের নির্যাস, সকল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যই আধ্যাত্ন-উপলব্ধির ভেতর দিয়ে সাধক আপন করে নেন। তার অনুভবে ধর্মের এক অভিন্ন রূপ ধরা পরে- সম্প্রদায় ধর্মের সীমাবদ্ধতাকে অতক্রম করে সর্বমানবিক ধর্মীয় চেতনার এক লোকায়ত ঐক্যসূত্র রচনা করে। হাসন রাজার সঙ্গীত, সাধনা ও দর্শনে এই চেতনার প্রতিফলন আছে। হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্যের যুগল পরিচয় তার গানে পাওয়া যায়। অবশ্য মনে রাখা প্রয়োজন, কয়েক পুরুষ পূর্বে হিন্দু ঐতিহ্যের ধারা হাছন রাজার রক্তে প্রবহমান ছিল। হাছন রাজার মরমীলোকে সাম্প্রদায়িক বিভেদের ঠাঁই ছিলোনা। তাই একদিকে ‘আল্লাজী’র ইশ্কে কাতর হাছন অনায়াসেই ‘শ্রীহরি’ বা ‘কানাই’-য়ের বন্দনা গাইতে পারেন। একদিকে হাসন বলেনঃ“আমি যাইমুরে যাইমু, আল্লার সঙ্গে, হাসন রাজায় আল্লা বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে।”
আবার পাশাপাশি তার কন্ঠে ধ্বনিত হয়ঃ“আমার হৃদয়েতে শ্রীহরি, আমি কি তোর যমকে ভয় করি। শত যমকে তেড়ে দিব, সহায় শিবশঙ্করী।।”
হাছনের হৃদয় কান্নায় আপ্লুত হয়,- ‘কি হইব মোর হাসরের দিন রে ভাই মমিন’,- আবার পাশাপাশি তার ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয় এভাবে,- ‘আমি মরিয়া যদি পাই শ্যামের রাঙ্গা চরণ’ কিংবা ‘দয়াল কানাই, দয়াল কানাই রে, পার করিয়া দেও কাঙ্গালীরে’। আবার তিনি বলেন,’ হিন্দুয়ে বলে তোমায় রাধা, আমি বলি খোদা’। স্পষ্টই হাছনের সাধনা ও সঙ্গীতে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের পুরাণ ও ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটেছে। এ বিষয়ে তিনি ছিলেন লালন ও অন্যান্য মরমী সাধকের সমানধর্মা।
হাছন রাজা কোন পন্থার সাধক ছিলেন তা স্পষ্ট জানা যায় না। তার পদাবলীতে কোন গুরুর নামোল্লেখ নেই। কেউ কেউ বলেন তিনি চিশ্তিয়া তরিকার সাধক ছিলেন। সূফীতত্ত্বের প্রেরণা ও প্রভাব তার সঙ্গীতে ও দর্শনে থাকলেও, তিনি পুরোপুরি এই মতের সাধক হয়তো ছিলেন না। নিজেকে তিনি ‘বাউলা’ বা ‘বাউল’ বলে কখনো কখনো উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি বাউলদের সমগোত্রীয় হলেও নিজে আনুষ্ঠানিক বাউল ছিলেন না। সূফীমতের সঙ্গে দেশীয় লোকায়ত মরমীধারা ও নিজস্ব চিন্তা-দর্শনের সমন্বয়ে তার সাধনার পথ নির্মিত হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। তার সঙ্গীতরচনার পশ্চাতে একটি সাধন-দর্শনের প্রভাব বলা যায়।
হাছন রাজার গানে আঞ্চলিক বুলি, প্রবচন ও বাগ্ধারার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। তার গানের ভাষাভঙ্গি ভাষাতাত্ত্বিকদের পর্যালোচনার আকর্ষনীয় উপকরণ হতে পারে। হাছন রাজার গানে ব্যবহৃত কিছু আঞ্চলিক শব্দ ও বাগ্ধারার তালিকা এখানে প্রণীত হলোঃ
আক্কল
জিয়ন
ভালা
ঠেকাইলায়
মুঞ্জিয়া
গানা
বেসক
বাড়ৈ
খেইড়
বন্ধে
লাঙ্গ
নাতিন
বুচা
লেইনজ
আজল
হাড়ুয়া পোক
মাড়ইল
গুড্ডি
ডুরি
হাউস
রেকি
উন্দা কল
মুস্করিয়া
টাটি
ছঙ্গাসন
খেওয়ানী
টন্কাইলে
আঞ্জা
খুবী
খেশ
ঢেন্ডুরা
ঠমকাইয়া
নাছন
গছে
ফাল্
পুতলা
ভৈসাল
জুংরা
সামাইল
লাইন্তি
চিনিবায়
কহন
বিকে
চিড়াবারা
কারাকারা
তারাবারচ
আঙ্গে আর ডাঙ্গে
আন্ধাইর গুন্ধাইর
হাছনের গান ও তার প্রকাশভঙ্গিতে গ্রামীণ সাবলীল ভাষা প্রকাশ পেয়েছে, যা শহুরে “ভদ্রলোক” সমাজের কাছে আপত্তিকর মনে হয়েছে। যেমন-
স্বামীর সেবা না করিলে, ধরাইব নি লাঙ্গে।।
লাঙ্গের সঙ্গে মন মজাইয়া হারাইলায় নিজ পতি।।
বুড়ি বড় হারামজাদা, ডাকে মোরে দাদা দাদা।।
হাসন রাজায় যায় তোদের মুখেতে হাগিয়া।।
মুতিয়া দে তোর বাপের মুখে, তার মুখে দে ছাই।।
হাছন রাজার কোনো কোনো গানে স্থান-কাল-পাত্রের পরিচয় চিহ্নিত আছে। লক্ষণছিরি ও রামপাশা-তার জন্মগ্রাম ও জমিদারী এলাকার উল্লেখ বারবার এসেছে। পাওয়া যায় সুরমা ও আঞ্চলিক নদী কাপনার নাম। কোন কোন গানে প্রসঙ্গ হিসেবে নিজেই উপস্থাপিত হয়েছেন। দিলারাম নামে তার এক পরিচারিকা, বেনামে সাধনসঙ্গিনী, মাঝে মাঝে তার গানে উপস্থাপিত হয়েছেনঃ“ধর দিলারাম, ধর দিলারাম, ধর দিলারাম, ধর। হাসন রাজারে বান্ধিয়া রাখ দিলারাম তোর ঘর।।”
কিংবা,“তোমরা শুন্ছনি গো সই। হাছন রাজা দিলারামের মাথার কাঁকই।।”
হাছন রাজা মুখে মুখে গান রচনা করতেন, আর তার সহচরবৃন্দ কী নায়েব-গোমস্তা সে সব লিখে রাখতেন। তার স্বভাবকবিত্ব এসব গানে জন্ম নিত, পরিমার্জনের সুযোগ খুব একটা মিলতনা। তাই কখনো কখনো তার গানে অসংলগ্নতা, গ্রাম্যতা, ছন্দপতন ও শব্দপ্রয়োগে অসতর্কতা লক্ষ করা যায়। অবশ্য এই ত্রুটি সত্ত্বেও হাছন রাজার গানে অনেক উজ্জ্বল পঙ্ক্তি, মনোহর উপমা-চিত্রকল্পের সাক্ষাৎ মেলে। তার কিছু গান, বিশেষ করে ‘লোকে বলে, বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নাই আমার’, ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারে’, ‘আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপরে’, ‘সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইল’, ‘মরণ কথা স্মরণ হইল না হাছন রাজা তোর’, ‘আমি যাইমুরে যাইমুরে আল্লার সঙ্গে’, ‘কানাই তুমি খেইর খেলাও কেনে’, ‘একদিন তোর হইব রে মরন রে হাসন রাজা’- সমাদৃত ও লোকপ্রিয় শুধু নয়, সঙ্গীত-সাহিত্যের মর্যাদাও লাভ করেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯ ডিসেম্বর ১৯২৫ Indian Philosophical Congress-এর প্রথম অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতির অভিভাষণে তিনি প্রসঙ্গক্রমে হাছন রাজার দুটি গানের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে তার দর্শন চিন্তার পরিচয় দেন। ভাষণটি ‘Modern Review’ ( January 1926 ) পত্রিকায় ‘The philosophy of Our People’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এর অনুবাদ প্রকাশিত হয় ‘প্রবাসী’ ( মাঘ ১৩২২ ) পত্রিকায়। ভাষণে হাছন রাজা সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক অংশ এখানে উদ্ধৃত হলো : “পূর্ববঙ্গের এক গ্রাম্য কবির [হাছন রাজা] গানে দর্শনের একটি বড় তত্ত্ব পাই সেটি এই যে, ব্যক্তিস্বরূপের সহিত সম্বন্ধ সূত্রেই বিশ্ব সত্য। তিনি গাহিলেন- “মম আঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন শরীরে করিল পয়দা শক্ত আর নরম আর পয়দা করিয়াছে ঠান্ডা আর গরম নাকে পয়দা করিয়াছে খুসবয় বদবয়।”
এই সাধক কবি দেখিতেছেন যে, শাশ্বত পুরুষ তাঁহারই ভিতর হইতে বাহির হইয়া তাঁহার নয়নপথে আবির্ভূত হইলেন। বৈদিক ঋষিও এমনইভাবে বলিয়াছেন যে, যে পুরুষ তাঁহার মধ্যে তিনিই আধিত্যমন্ডলে অধিষ্ঠিত।“রূপ দেখিলাম রে নয়নে, আপনার রূপ দেখিলাম রে। আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল আমারে।।”
১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হিবার্ট লেকচারে’ রবীন্দ্রনাথ ‘The Religion of Man’ নামে যে বক্তৃতা দেন তাতেও তিনি হাছন রাজার দর্শন ও সঙ্গীতের উল্লেখ করেন।
হাসন রাজার জীবনের উপর ভিত্তিকৃত প্রথম চলচ্চিত্র ‘হাসন রাজা‘ ২০০২ সালে মুক্তি পায়। এটির পরিচালনা করেন চাষী নজরুল ইসলাম এবং প্রযোজনা করেন এই চলচ্চিত্রের মূখ্য অভিনেতা হেলাল খান। এতে আরো অভিনয় করেছেন ববিতা, সিমলা, অমল বোস প্রমূখ।
হাসন রাজার জীবনের উপর ভিত্তিকৃত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘হাসন রাজা” ২০১৭ সালে মুক্তি পায়। বাংলাদেশ – ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এ চলচ্চিত্রের পরিচালনা করেন বাংলাদেশী চলচ্চিত্র পরিচালক রুহুল আমিন। এতে অভিনয় করেন ভারতীয় অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী এবং অভিনেত্রী রাইমা সেন।
উস্তাদ শাহ আবদুল করিম (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯১৬ – ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯)হচ্ছেন একজন বাংলাদেশী কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী, সুরকার, গীতিকার ও সঙ্গীত শিক্ষক। তিনি বাউল সঙ্গীতকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কর্মজীবনে তিনি পাঁচশো-এর উপরে সংগীত রচনা করেছেন।বাংলা সঙ্গীতে তাঁকে বাউল সম্রাট হিসাবে সম্বোধন করা হয়।তিনি বাংলা সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০০১ সালে একুশে পদক পুরস্কারে ভূষিত হন।
শাহ আবদুল করিম ইব্রাহিম আলী ও নাইওরজানের ঘরে ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খুব ছোটবেলায় তার গুরু বাউল শাহ ইব্রাহিম মাস্তান বকশ থেকে সঙ্গীতের প্রাথমিক শিক্ষা নেন। তিনি আফতাব-উন-নেসা কে বিয়ে করেন, যাকে তিনি সরলা নামে ডাকতেন। তিনি ১৯৫৭ সাল থেকে তার জন্মগ্রামের পাশে উজানধল গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলে সকল অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরূদ্ধে। তিনি তার গানের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন প্রখ্যাত বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ এবং দুদ্দু শাহ এর দর্শন থেকে। যদিও দারিদ্র তাকে বাধ্য করে কৃষিকাজে তার শ্রম ব্যয় করতে কিন্তু কোন কিছু তাকে গান সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি বাউলগানের দীক্ষা লাভ করেছেন সাধক রশীদ উদ্দীন, শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বকশ এর কাছ থেকে। তিনি শরীয়তী, মারফতি, দেহতত্ত্ব, গণসংগীতসহ বাউল গান এবং গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন।
স্বশিক্ষিত বাউল শাহ আব্দুল করিম এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক গান লিখেছেন এবং সুরারোপ করেছেন। বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে তার ১০টি গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। কিশোর বয়স থেকে গান লিখলেও কয়েক বছর আগেও এসব গান শুধুমাত্র ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছেই জনপ্রিয় ছিল। তার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে বেশ কয়েকজন শিল্পী বাউল শাহ আব্দুল করিমের গানগুলো নতুন করে গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলে তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন। বাউলসাধক শাহ আবদুল জীবনের একটি বড় অংশ লড়াই করেছেন দরিদ্রতার সাথে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় তার সাহায্যার্থে এগিয়ে এলেও তা তিনি কখনোই গ্রহণ করেননি। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে সাউন্ড মেশিন নামের একটি অডিও প্রকাশনা সংস্থা তার সম্মানে জীবন্ত কিংবদন্তিঃ বাউল শাহ আবদুল করিম নামে বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া তার জনপ্রিয় ১২ টি গানের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। এই অ্যালবামের বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ তার বার্ধক্যজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য তার পরিবারের কাছে তুলে দেয়া হয়। ২০০৭ সালে বাউলের জীবদ্দশায় শাহ আবদুল করিমের জীবন ও কর্মভিত্তিক একটি বই প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয়, ‘শাহ আবদুল করিম সংবর্ধন-গ্রন্থ’ (উৎস প্রকাশন) নামের এই বইটি সম্পাদনা করেন লোকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক সুমনকুমার দাশ। শিল্পীর চাওয়া অনুযায়ী ২০০৯ সালের ২২ মে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ও খান বাহাদুর এহিয়া ওয়াকফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লি ড. জাফর আহমেদ খানের উদ্যোগে বাউল আব্দুল করিমের সমগ্র সৃষ্টিকর্ম নিয়ে গ্রন্থ ‘শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র’ প্রকাশিত হয়।বইটির পরিবেশক বইপত্র।শাহ আবদুল করিমের জনপ্রিয় কিছু গানঃ
বাউল শাহ আবদুল করিমের এ পর্যন্ত ৭টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। তার মৃত্যুর কিছুদিন আগে সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে তার রচনাসমগ্র (অমনিবাস)-এর মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। এছাড়াও সুমনকুমার দাশ সম্পাদিত শাহ আব্দুল করিম স্মারকগ্রন্থ (অন্বেষা প্রকাশন) তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। এর আগে-পরে শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে সুমনকুমার দাশের ‘বাংলা মায়ের ছেলে : শাহ আবদুল করিম জীবনী’ (অন্বেষা প্রকাশন), ‘সাক্ষাৎকথায় শাহ আবদুল করিম’ (অন্বেষা প্রকাশন), ‘শাহ আবদুল করিম’ (অন্বেষা প্রকাশন), ‘বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম’ (উৎস প্রকাশন), ‘গণগীতিকার শাহ আবদুল করিম’ (উৎস প্রকাশন) প্রকাশিত হয়। সর্ব শেষ ২০১৬ সালে ঢাকার প্রখ্যাত প্রকাশনাসংস্থা প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয় সুমনকুমার দশের ‘শাহ আবদুল করিম : জীবন ও গান’ বইটি। এ বইটি ইতোমধ্যেই একটি প্রামণ্য জীবনী হিসেবে বোদ্ধামহলে স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে। এ বইটিতে করিমের নির্বাচিত বেশ কিছু গানও সংকলিত হয়েছে। শাহ আবদুল করিমের জীবনভিত্তিক প্রথম উপন্যাস সাইমন জাকারিয়া রচিত “কূলহারা কলঙ্কিনী” প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে।
বাউল শাহ আব্দুল করিম ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। বাংলা একাডেমি তার দশটি গানের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে। শাকুর মজিদ তাকে নিয়ে নির্মাণ করেছেন ভাটির পুরুষ নামে একটি প্রামাণ্য চিত্র। এছাড়াও সুবচন নাট্য সংসদ তাকে নিয়ে শাকুর মজিদের লেখা মহাজনের নাও নাটকের ৮৮টি প্রদর্শনী করেছে।
২০০৯ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম মৃত্যু বরণ করেন।সেই দিন শনিবার সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে সিলেটের একটি ক্লিনিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সিলেটের নুরজাহান পলি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন আব্দুল করিমকে ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার দুপুর থেকেই লাইফসাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়ে ছিল।
বখতিয়ার খিলজির সমাধি… (গঙ্গারামপুর ) যিনি বাংলার লক্ষণ সেনকে পরাস্ত করে প্রথম বাংলা দখল করেন। বাংলা ও বিহার অঞ্চলে প্রথম মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন তুর্কি সেনাপতি ও বীর যোদ্ধা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি। তিনি ছিলেন তুর্কি জাতিভুক্ত খিলজি বংশের সন্তান। বখতিয়ার খিলজির পূর্বপুরুষ আফগানিস্তানের গরমশির অঞ্চলে বাস করতেন। অল্প বয়সে তিনি ভাগ্যান্বেষণে বের হন এবং বহু দরবার ঘুরে অযোধ্যার শাসক হুসামুদ্দিনের সেনাবাহিনীতে থিতু হন।
হুসামুদ্দিন তাঁকে ‘ভগবত’ ও ‘ভিউলা’ নামক দুটি পরগনার জায়গির দান করেন। এর পরই তাঁর জীবনধারা বদলে যায় এবং নিজেকে একজন শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পান। একজন যোগ্য শাসক ও সেনাপতি হিসেবে বখতিয়ার খিলজির সুনাম ছড়িয়ে পড়লে দিল্লির শাসক কুতুবুদ্দিন আইবেকের সুদৃষ্টি লাভ করেন এবং তাঁর আনুগত্য স্বীকারের বিনিময়ে বিহার অভিযানের অনুমতি পান। বিহার বিজয়ের পর বখতিয়ার খিলজির ক্ষমতা ও সামর্থ্য আরো সংহত হয়।
তিনি বিশাল এক বাহিনী গঠন করেন এবং ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা লক্ষ্মণ সেনের শাসনাধীন বাংলার নদীয়া জয় করেন। আকস্মিক আক্রমণে রাজা লক্ষ্মণ সেন প্রধান রাজধানী বিক্রমপুর পালিয়ে যান। এভাবেই বাংলার মাটিতে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। এরপর তিনি ধীরে ধীরে লক্ষ্মণাবতী, গৌড়সহ সমগ্র উত্তরবঙ্গ বিজয় করেন।
লক্ষ্মণাবতীর নাম পরিবর্তন করে লখনৌতি করে তাকে রাজধানী ঘোষণা করেন। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি তিব্বত অভিযানে বের হন। কিন্তু উপজাতিদের বিশ্বাসঘাতকতা ও কূটকৌশলের কাছে পরাস্ত হন। এতে তাঁর সেনাদলের বৃহদাংশ ধ্বংস হয়ে যায়। তিব্বত বিপর্যয়ের পর ব্যর্থতার গ্লানি ও শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দেবকোটে (বর্তমান দিনাজপুর) ফিরে আসেন। এখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তবে কেউ কেউ বলেন মীর মর্দানের হাতে নিহত হন। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি ইতিহাসের পাতায় যতটা উচ্চারিত, যতটা চর্চিত, যতটা স্মরিত; ঠিক ততটাই অবহেলিত ও অজ্ঞাত বখতিয়ারের সমাধিস্থল। বখতিয়ার খিলজির কবর যে এখনো চিহ্নিত আছে তা-ও হয়তো বহু মানুষের জানা নেই। বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠাতা বখতিয়ার খিলজি বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় ঘুমিয়ে আছেন। জেলার গঙ্গারামপুর থানায় পীরপালে এখনো টিকে আছে তাঁর সমাধিসৌধ।
অযত্নে-অবহেলায় ধ্বংসের মুখে বখতিয়ার খিলজির সমাধিসৌধও। সমাধিস্থলে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে বারো দুয়ারি ও দীঘির ঘাট এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। ধসে গেছে সমাধিসৌধের দেয়ালের একাংশ। ধারণা করা হয়, বারো দুয়ারি নামে চিহ্নিত স্থাপনাটি মূলত একটি মসজিদ ছিল। মসজিদের মুসল্লি ও কবর জিয়ারতকারীদের অজুর জন্য পাথর বাঁধানো ঘাট তৈরি করা হয়েছিল। সমাধি ও বারো দুয়ারি পাথরের দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। তবে ব্রিটিশ সার্ভেয়ার স্যার ফ্রান্সিস বুকানন হামিল্টন, যিনি ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে উত্তরবঙ্গ ও বিহারের জরিপকাজে নিযুক্ত হন। তিনি বখতিয়ার খিলজির সমাধির বিবরণ দেওয়ার সময় বারো দুয়ারির ভেতরে একটি কবর আছে বলে উল্লেখ করেছেন। স্যার হামিল্টনের ধারণা বারো দুয়ারির কবরটিই বখতিয়ার খিলজির এবং এখনো টিকে থাকা কবরটি বখতিয়ারের সহচর পীর বাহাউদ্দিনের। অবশ্য সমাধিসৌধের সামনে টানানো বতর্মান নামফলকে স্যার হামিল্টনের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং টিকে থাকা সৌধটিকেই বখতিয়ারের বলে দাবি করা হয়েছে।
বর্তমানে কালের নিয়মে বখতিয়ার খিলজির সমাধি অবহেলার পাত্র হলেও স্থানীয় সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘দেবতুল্য’। কথিত আছে বখতিয়ার খিলজি মাটিতে শুয়ে আছেন বলে পীরপালের মানুষরা খাট বা চৌকিতে ঘুমায় না। তারা অনেকাংশে শত শত বছর ধরে মাটিতেই ঘুমিয়ে আসছে।
ক্বীনব্রীজ হলো বাংলাদেশেরসিলেট শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদীর উপর স্থাপিত একটি লৌহ নির্মিত সেতু। এটি সিলেটের অন্যতম দর্শনীয় এবং ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে সবার কাছে পরিচিত। সুরমা নদীর ওপর নির্মিত এই স্থাপনাটি একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবেও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই ব্রীজটিকে সিলেট শহরের “প্রবেশদ্বার” বলা হয়। ব্রীজটি ব্রিটিশ গভর্নর মাইকেল ক্বীন এর নামে নামকরণকৃত।
সিলেট শহরের কেন্দ্রস্থলে ক্বীন ব্রীজটি অবস্থিত। এর এক দিকে দক্ষিণ সুরমা ও অপর দিকে বন্দর বাজার। এই ব্রীজটি সিলেট শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদীর উপর অবস্থিত, এবং বাংলাদেশের রাজধানী, ঢাকা শহর থেকে ২৪৬ কিলোমিটার (১৫৩ মা) উত্তরপূর্ব দিকে অবস্থিত। সিলেট রেলওয়ে স্টেশন থেকে এই ব্রীজটি মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
গত শতকের তিরিশের দশকের দিকে আসাম প্রদেশের গভর্নর ছিলেন মাইকেল ক্বীন। তিনি সিলেট সফরে আসেন। তার স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতেই এ ব্রীজটি নির্মাণ হয় এবং এই ব্রীজটির নামকরণ করা হয় গভর্নর মাইকেল ক্বীনের নামানুসারে, যিনি ১৯৩২ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত আসামের একজন ইংরেজ গভর্নর ছিলেন।
আসাম প্রদেশের গভর্নর মাইকেল ক্বীন সিলেট সফরে আসার জন্য সুরমা নদীতে ব্রীজ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কারণ তখন আসামের সাথে সিলেটের যোগাযোগের মাধ্যম ছিল ট্রেন। ফলে, রেলওয়ে বিভাগ ১৯৩৩ সালে সুরমা নদীর ওপর ব্রীজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় এবং নির্মাণ শেষে ১৯৩৬ সালে ব্রীজটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়।
আব্দুল মজিদ কাপ্তান মিয়া,তৎকালীন আসাম সরকারের এক্সিকিউটিভ সদস্য রায় বাহাদুর প্রমোদ চন্দ্র দত্ত এবং শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদ ব্রীজটি নির্মাণের ক্ষেত্রে অশেষ অবদান রাখেন।
ক্বীন ব্রীজ লোহা দিয়ে তৈরী। এর আকৃতি ধনুকের ছিলার মত বাঁকানো। এই ব্রীজটির দৈর্ঘ্য ১১৫০ ফুট এবং প্রস্থ ১৮ ফুট। ব্রীজ নির্মাণে তৎকালীন সময়ে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৫৬ লাখ টাকা।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীডায়নামাইট দিয়ে ব্রীজের উত্তর পাশের একাংশ উড়িয়ে দেয়; যা স্বাধীনতার পর কাঠ ও বেইলী পার্টস দিয়ে মেরামত করা হয় ও হালকা যান চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হয়।
১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের সহযোগিতায় ব্রীজের বিধ্বস্ত অংশটি কংক্রীট দিয়ে পুনঃনির্মাণ করা হয়। এবং তৎকালীন নৌ বাহিনীর প্রধান রিয়াল এডমিরাল এম এইচ খান সংস্কারকৃত ব্রীজটি উদ্বোধন করেন; ফলে পুনরায় এটি দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়।
আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ছিলেন একজন আলেম, তরীকতের মুর্শিদ। তার লেখা অনেক উর্দু ও আরবি গ্রন্থ ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে রয়েছে।
শিক্ষাজীবনের প্রারম্ভে তিনি তার চাচাতো ভাই ফাতির আলীর নিকট লেখাপড়া করেন। অতঃপর ফুলতলী মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে তিনি বদরপুর সিনিয়র মাদ্রাসায় উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর রামপুর আলিয়া ও মাতলাউল উলুম মাদ্রাসায় হাদিস শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। ১৩৫৫ হিজরীতে তিনি মাতলাউল উলুম মাদ্রাসায় ১ম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে হাদিস শরীফের সর্বোচ্চ সনদ অর্জন করেন। তার গুরুদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আল্লামা খলিলুল্লাহ রামপুরী ও আল্লামা ওয়াজিহুদ্দীন রামপুরী। এ ছাড়া তিনি শাহ আব্দুর রউফ করমপুরী ও শায়খুল কুররা আহমদ হেজাযী এর নিকট থেকে ইলমে কিরাতের সনদ অর্জন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি শায়খুল কূররার নিকট থেকে ইলমে কিরাতের সর্বোচ্চ সনদ অর্জন করেন।
১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিনি বদরপুর আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৪ সাল থেকে গাছবাড়ী জামেউল উলুম মাদ্রাসায় অধ্যাপনা করেন। এ সময় মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষের দায়িত্ব পলন করেন। এরপর সৎপুর কামিল মাদরাসা, ইছামতি ও বাদেদেওরাইল ফুলতলী আলিয়া মাদ্রাসায়হাদিস শাস্ত্র অধ্যাপনা করেন। এ ছাড়া তিনি শুদ্ধভাবে কোরআন তিলাওয়াত শিক্ষাদানের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট। দেশ বিদেশে প্রতিষ্ঠা করেন অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।
লতিফ চৌধুরী ছিলেন তরীকায়ে কাদেরিয়া, চিশতীয়া, নক্সবন্দীয়া, মুজাদ্দেদিয়া ও মুহাম্মদিয়ার মুর্শিদ। তিনি আজীবন উপর্যুক্ত তরিকা সমূহের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত ছিলেন। তার তরিকতের সিলসিলা নিম্নরূপ:
আল্লামা ফুলতলী ১৬ জানুয়ারি ২০০৮ সালে সিলেট শহরে তার প্রতিষ্ঠিত শাহজালাল দারুচ্ছুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসা সংলগ্ন বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন।ঐদিন বিকাল ৪টা সময় তার গ্রামের বাড়ির পাশে অবস্থিত বালাই হাওরে জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযা শেষে তার প্রতিষ্ঠিত জামে মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর অনুসারীরা তাঁর উত্তরসূরী হিসেবে মনোনীত করেছেন তাঁর বড় ছেলে মো. ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলীকে। মো. ইমাদ উদ্দিন প্রাথমিক জীবনে শিক্ষকতা করতেন। ১৯৭৮ সালে সৎপুর কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ থাকাকালে চাকরি ছেড়ে স্থায়ীভাবে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। এরপর অবৈতনিকভাবে ইছামতি কামিল মাদ্রাসা ও পরে বাদেদেওরাইল কামিল মাদ্রাসায় অধ্যাপনা করেন। পিতার মৃত্যুবরণের পর থেকে তিনি পিতার স্থলাভিষিক্ত হন।
আল-বিরুনি: ভুলে যাওয়া প্রতিভা যিনি পৃথিবীকে পরিমাপ করেছিলেন আল-বিরুনি (প্রায় 1,000 বছর আগে) আজকের স্বীকৃত মানের তুলনায় 99.7% নির্ভুলতার সাথে পৃথিবীর🌍 পরিধি পরিমাপ📏📐 করেছিলেন। আল-বিরুনি ছিলেন একজন পারস্য পলিম্যাথ যিনি ৯৭৩ থেকে ১০৪৮ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, পদার্থবিজ্ঞান এবং ইতিহাস সহ অনেক ক্ষেত্রের পণ্ডিত ছিলেন। ১০৩০ সালে আল-বিরুনি পৃথিবীর পরিধি পরিমাপের জন্য ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করেন। তার অনুমান ছিল 6339.6 কিলোমিটার, যা 6378.1 কিলোমিটারের আধুনিক স্বীকৃত মূল্যের 0.3% এর মধ্যে। আল-বিরুনির পদ্ধতিটি এই নীতির উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল যে পৃথিবীর বক্রতার কারণে দিগন্তটি সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে নীচে প্রদর্শিত হয়। তিনি দিগন্ত এবং একটি প্লাম্ব লাইনের মধ্যবর্তী কোণটি দুটি ভিন্ন স্থানে পরিমাপ করেছিলেন এবং এই তথ্যটি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ গণনা করতে ব্যবহার করেছিলেন। আল-বিরুনির পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ ছিল তার সময়ের অন্যতম সঠিক পরিমাপ।
১.বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট -সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানা ২.বাংলাদেশের প্রথম নারী ট্রেন চালক -সালমা খাতুন ৩.বাংলাদেশের মেট্রোরেলের প্রথম নারী চালক -মরিয়ম আফিজা
অবশেষে বহুপ্রতীক্ষিত সেই ৭ই ডিসেম্বর এল। সাজসাজ সাড়া পড়ে গেল সারা শহরে। বিকাল ৫টা বাজতে না বাজতেই লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল আহসানমঞ্জিলের আশপাশের এলাকা। নবাব আহসানউল্লার আমন্ত্রণে গণ্যমান্য অতিথিরাও এসে গেলেন আহসানমঞ্জিলে। ঐতিহাসিক এই ঘটনা উদ্বোধনের জন্য বাংলার ছোট লাট স্যার জন উডবার্নকে আগেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়াতে তার পক্ষ থেকে কলকাতা থেকে সি. ডাব্লিউ বোল্টন এসে পৌঁছালেন। ঢাকায় জ্বলে উঠল বিদ্যুৎ বাতি!
বিজলী বাতি আবিষ্কারের তিন বছর পর ১৮৮২ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর এডিসন সাহেব সুইচ টিপে নিউ ইয়র্ক শহরের পার্ল স্ট্রিটে ৫৯ জন গ্রাহকের বাসায় বিজলী বাতি জ্বেলে দিলেন। এর উনিশ বছরের মাথায় ১৯০১ সালের ৭ই ডিসেম্বর বিজলী বাতির আলোয় ঝলমল করে উঠল আমাদের ঢাকা শহর। অবশ্য গোটা শহরকে তখন এর আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। তবে যেটুকু হয়েছিল, তাতেই ঢাকাবাসীর আনন্দের সীমা ছিল না। কারণ বিজলী বাতির কথা তারা শুনেছে মাত্র। সেই বাতির আলো পাওয়া তখনো তাদের জন্য ছিল অকল্পনীয়।
এর আগে ঢাকার রাস্তায় জ্বলত কেরোসিনের বাতি, তাও সব রাস্তায় নয়। ব্রিটেনের রাণী ভিক্টোরিয়াকে ভারত সম্রাজ্ঞী হিসাবে ঘোষণা উদযাপনের জন্য ১৮৭৭ সালে ঢাকা শহরে বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি নানা উত্সব আয়োজনের অংশ হিসাবে ওয়াইজঘাটে অবস্থিত তত্কালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যাল অফিস থেকে চকবাজার পর্যন্ত রাস্তা আলোকিত করতে একশ’টি ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়।
এর এক বছর পর কমিটির সদস্যদের চাঁদায় (চাঁদার মোট পরিমাণ সাড়ে ছয় হাজার টাকা) এসব ল্যাম্পপোস্ট বসানো হয়েছিল এবং এগুলোতে লাগানো হয়েছিল ৬০টি কেরোসিনের বাতি। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা মিউনিসিপ্যালিটির লোক লম্বা লম্বা মই নিয়ে এসে জ্বেলে দিত এসব কেরোসিনের বাতি। বিদ্যুতের লোডশেডিং বলে কোন শব্দের সঙ্গে পরিচিত ছিল না ঢাকাবাসী। তবে একটু জোর হাওয়া দিলে বা ঝড়-বৃষ্টি হলেই এসব বাতি নিভে গিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে যেত ঢাকার সব রাস্তা-ঘাট।
১৮৮৬ সালে শোনা গেল, ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনিকে স্যার উপাধি দেবে ব্রিটিশ সরকার। একথা শুনে নবাব খাজা আহসানউল্লাহ যারপরনাই খুশি হলেন। তিনি বললেন, “সদাশয় সরকার বাহাদুর যদি সত্যিই আমার পিতাকে এই ‘ইজ্জত’ প্রদান করে তবে কথা দিচ্ছি, ঢাকাবাসীদের আমি খুশি করে দেব।”
সেই বছরই খাজা আবদুল গনিকে ব্রিটিশ সরকার ‘নাইট কমান্ডার অব স্টার অব ইন্ডিয়া’ উপাধি প্রদান করে। ভারতের বড় লাট লর্ড ডাফরিন ১৮৮৮ সালে ঢাকা পরিদর্শনে এসে নবাব আহসানউল্লাহর এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কেরোসিনের সড়ক-বাতির পরিবর্তে গ্যাসের সড়ক-বাতি লাগানো কর্মসূচির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৮৯১ সালে নবাবের পক্ষ থেকে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্যাসের বাতি লাগানোর প্রস্তাব দেয়া হয়।
তবে নবাবের সেই প্রস্তাবের বাস্তবায়ন হয়নি। ১৮৯৭ সালে সে আমলে নগরীতে সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা পত্রিকা ‘ঢাকা প্রকাশে’ লেখা হয়,
“আজ হইতে বারো বত্সর পূর্বে নবাব খাজা আহসানউল্লাহ ঢাকা শহরের সড়কে কেরোসিনের বাতির পরিবর্তে গ্যাসের বাতি লাগাইবার প্রতিশ্রুতি প্রদান করিয়াছিলেন। মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষের ওপর তিনি আস্থা রাখিতে না পারায় সম্ভবত তাহার সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয় নাই। তবে এইবার নবাব সাহেবের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় নবাব খাজা ইউসুফ জান মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় আমরা আশা করিতেছি, তাহার সেই অবিশ্বাস দূরীভূত হইবে এবং নবাব সাহেবের সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটিবে।”
রাস্তা আলোকিত করার যে প্রতিশ্রুতি নবাব আহসানউল্লাহ ঢাকাবাসীকে দিয়েছিলেন, তা তিনি কখনো ভোলেননি। তাই ঢাকার রাস্তায় বিজলী বাতি জ্বালবার জন্য ১৯০১ সালেই তিনি ঢাকা ইলেকট্রিক লাইট ফান্ড গঠন করে তাতে সাড়ে চার লক্ষ টাকা প্রদান করেন। সেই বছরই ৫ই জুলাই ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির তত্ত্বাবধানে ‘দ্য ঢাকা ইলেকট্রিক লাইট ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়।
ট্রাস্টের পক্ষ থেকে পত্রিকায় প্রচারিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঢাকা শহরের রহমতগঞ্জ সড়ক, চকবাজার সার্কুলার রোড, মোগলটুলি রোড, নালগোলা রোড, বাবুবাজার রোড, কমিটিগঞ্জ রোড, আরমেনিয়া স্ট্রিট, ইসলামপুর রোড, আহসানমঞ্জিল রোড, পাটুয়াটুলি রোড, বাংলাবাজার রোড, ডাল বাজার রোড. ফরাশগঞ্জ, লোহারপুল রোড, দিগবাজার রোড. ভিক্টোরিয়া পার্ক, লক্ষ্মীবাজার রোড, সদরঘাট রোড. শাঁখারিবাজার রোড. জনসন রোড. নবাবপুর রোড. রেলওয়ে স্টাফকোয়ার্টার রোড. জামদানি নগর রোড ও রাজার দেউড়ি লেনে বিদ্যুত্ বাতি লাগানো হবে।
৭ ডিসেম্বর, ১৯০১। আহসানমঞ্জিল চত্বরে বানানো বিশাল মঞ্চের সবার মাঝখানে বসলেন স্যার বোল্টন, তার ডানদিকে বসলেন নবাব আহসানউল্লাহ, বামদিকে মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনারবৃন্দ। বোল্টন সাহেব ঢাকার রাস্তায় বিদ্যুত্ বাতির ব্যবস্থা করার জন্য নবাব আহসানউল্লাহকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন,
“আজ থেকে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটিরও দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেল। ঢাকার সরু সরু রাস্তাঘাট, অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে এই বিদ্যুত্ বাতি বড়ই বেমানান। আমরা আশা করি, মিউনিসিপ্যালিটি এ বিষয়টির দিকে নজর দেবে।”
এর পরই তিনি সুইচ টিপে বিজলী বাতি জ্বেলে দিলেন। প্রথম বিজলী বাতি জ্বলল ঢাকা শহরে। বহু নগরবাসী পরম বিস্ময়ে দেখল, বিনা তেলে, বিনা গ্যাসে জ্বলছে বাতি—আরো উজ্জ্বল, আরো স্থির।